বুধবার - জুন ১৯ - ২০১৯ ||
Home / শিল্প ও সাহিত্য / ঐতিহ্য / নববর্ষে শাহজাদপুরে কবিগুরুর কাছারিবাড়ি ও বাণিজ্য মেলায় দর্শণার্থীদের ভীড় উপচে পড়ছে

নববর্ষে শাহজাদপুরে কবিগুরুর কাছারিবাড়ি ও বাণিজ্য মেলায় দর্শণার্থীদের ভীড় উপচে পড়ছে

স্বাধীন কথা ডটকম, রোববার, ১৪ এপ্রিল-২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ : আজ রোববার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। এদিন সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র শাহজাদপুর কাপড়ের হাট সংলগ্ন এলাকায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে বৈশাখী সাজে দেশী বিদেশী রবীন্দ্রভক্ত পর্যটকদের ঢল উপচে পড়েছে। বর্ণাঢ্য বৈশাখী সাজে তাদের পদচারনায় ও মিলনমেলায় মুখরিত ও প্রাঞ্জলিত হয়ে ওঠে বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত কাছাড়িবাড়ি প্রাঙ্গণসহ আশপাশের অঞ্চল। বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরের কাছাড়িবাড়িতে এসে ভক্তরা কবিগুরুর ব্যবহৃত বসতবাড়ি, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি দেখে তৃপ্তি ঢেঁকুর ফেলে ঘরে ফিরছেন। অতীতের তুলনায় এদিনের পহেলা বৈশাখে কবিগুরুর কাছারিবাড়িতে রেকর্ড পরিমান রবীন্দ্রভক্ত দেশী-বিদেশী নারী, পুরুষ, শিশু কিশোর, যুবক-যুবতীর সমাগম ঘটে।
পহেলা বৈশাখে কবিগুরুর কাছারিবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায় কাছারিবাড়িতে তিল ধারনের যায়গা নেই এমন অবস্থা। প্রচন্ড ভীড় উপেক্ষা করেও সুশৃংখলভাবে ভক্তবৃন্দ কবিগুরুর ব্যবহৃত বিভিন্ন তৈজসপত্র ও ছবি দিয়ে সাজানো রবীন্দ্র স্মৃতি যাদুঘর পরিদর্শন করেন। জানা যায়, প্রতি বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাহজাদপুরের কাছাড়িবাড়িতে অসংখ্য দেশী বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পহেলা বৈশাখে এখানে বৈশাখী সাজে এদিনও জনমানুষের ঢল পরিলক্ষিত হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সাথে শাহজাদপুর হাইস্কুল মাঠে শিল্প ও বাণিজ্য মেলা চলমান থাকায় পুরো শাহজাদপুর পর্যটন শহরে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিন তৌজির অন্তর্গত ডিহি শাহজাদপুরের জমিদারী একদা নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারীর অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারী নিলামে উঠলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র তের টাকা দশ আনায় এই জমিদারী কিনে নেন। জমিদারীর সাথে সাথে ওই কাছারিবাড়িও ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আগে কাছারিবাড়ির মালিক ছিল নীলকর সাহেবরা। ১৮৯০ সাল থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাঠ ঠাকুর জমিদারী দেখাশোনার কাজে শাহজাদপুরে সাময়িকভাবে আসা যাওয়া ও বসবাস করতেন। তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। সম্ভবত এই কারণেই শিলাইদহে তাঁর বাসগৃহ কুঠিবাড়ি নামে এবং শাহজাদপুরের বাড়িটি কাছারিবাড়ি নামে পরিচিত। শাহজাদপুরে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন পালকিতে, নৌকায় ও পায়ে হেটে। শাহজাদপুর পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্র দ্বারিয়াপুর বাজারে অবস্থিত উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত শাহজাদপুর কাপড়ের হাটের দক্ষিণ পাশে এক সবুজ শ্যামল পরিবেশে কাছারিবাড়ি অবস্থিত। শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত একটি দ্বিতল ভবন। ভবনটির দৈর্ঘ্য ২৬.৮৫ মিটার, প্রস্থ ১০.২০ মিটার এবং উচ্চতা ৮.৭৪ মিটার। ভবনটির দ্বো-তলার সিড়ি ব্যাতিত মোট সাতটি কক্ষ রয়েছে। ভবনটির উত্তর দক্ষিণে একই মাপের প্রশস্ত বারান্দা, বারান্দার গোলাকৃতির জোরামাপের খাম ও উপরাংশে আছে অলংকরণ করা বড় মাপের দরজা, জানালা ও ছাদের ওপরে প্যারাপেট দেয়ালে পোড়ামাটির শিল্পকর্ম পর্যটক ও ভক্তদের বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়ে থাকে। ভবনটির জানালা দিয়ে চারপাশের মনোরম, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ কবিগুরু উপলব্ধি করতেন। কাছারিবাড়িতে বসেই রবি কবি প্রাণভরে ছোট নদী দেখতেন ও শুনতেন ছোটনদীর স্রোতধারার মিশ্রিত সুর।
শাহজাদপুরে এসে মানুষ ও প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালবেসেছিলেন কবিগুরু। এখানে তিনি খুজে পেয়েছিলেন সাহিত্য সৃষ্টির নানা উপাদান। এখানে অবস্থানকালে তিনি রচনা করেন, সোনারতরী , বৈষ্ণব কবিতা, দুটি পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, যমুনা, হৃদয়, ভরা ভাদরে, প্রত্যাক্ষান ও লজ্জা, চিত্রা, শীত ও বসন্তে, নগর সংগীত, নদীযাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, স্মৃতি বিলয়, প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, যাত্রী, তৃণ, ঐশ্বর্য, স্বার্থ, প্রেয়সী, শান্তিময়, কালিদাসের প্রতি, কুমার, মানষলোক, কাব্য প্রার্থনা, ইছামতী নদী, সুশ্রুসা, অশিক্ষাগ্রহন, বিদায়, নববিবাহ, রজ্জিতা, বিদায়, হত্যভাগ্যেও গান, গতোনিক, বঞ্চনা, সংকোচ, মানষপ্রতিভা, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সম্পত্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি ইত্যাদি। এছাড়া কবিগুরু এখানে অবস্থান করে ৩৮ টি বিভিন্ন ছিন্ন পত্রাবলী। পঞ্চভূতের অংশবিশেষ ও নাটক বিসর্জন রচনা করেছিলেন।
শাহজাদপুরে কবিগুরুর কাছারিবাড়ির দ্বো-তলার আশপাশে শোভা বর্ধনের জন্য নানা ফুলের গাছে ঘেরা কবিগুরুর অপরূপ কাছারিবাড়িটি বহুদুরের পথিকেরও দৃষ্টি আকর্ষন করে। কাছারিবাড়ির চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের আশেপাশে রয়েছে নানা দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষের বাগান। কাছারিবাড়ির ভিতরে একটি বকুলগাছ ছিল। কবি ওই গাছের নীচে বসে কবিতা লিখতেন। ১৯৬৯ সালে প্রতœতত্ব্ অধিদপ্তর কর্তৃক অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় কাছাড়িবাড়িকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এরপর কাছাড়িবাড়ির মূল ভবনটির নানা সংস্কার কাজ সমাপ্ত করে ভবনটিতে রবীন্দ্রভিত্তিক আলোকচিত্র ও কবিগুরুর ব্যবহৃত নানা আসবাপত্র তৈজসপত্র সরঞ্জামাদি নিয়ে একটি রবীন্দ্রস্মৃতি যাদুঘরের রুপ দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে ওই যাদুঘরে প্রবেশ করতে হয়। নিচতলা ও দ্বো-তলার বিশাল হলরুমসহ যাদুঘরের সকল কক্ষ দেশি বিদেশি পর্যটকসহ সর্বসাধারনের দর্শণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। চারদিকে পাঁকা দেয়ালে বেষ্ঠিত কাছারিবাড়ির আঙ্গিনাটিও বেশ বড়। এখানে রয়েছে রবীন্দ্র মিলনায়তন, কবিগুরুর ব্যবহৃত সামগ্রীর মধে চৌকি, লেখার জন্য ডেস্ক, সোফাসেট, আরাম কেদারা, আলনা, আলমারী, সিন্দুক, ঘাস কাটার যন্ত্র, ওয়াটার ফিল্টার, ল্যাম্প, কবির স্বহস্তে আঁকা ছবি, দেশী বিদেশী রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানীসহ গুণীজনদের সাথে তোলা কবিগুরুর অগনিত ছবি। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত এসব স্মৃতিচিহ্ন নিজ চোখে এক নজর দেখার জন্য পহেলা বৈশাখে শাহজাদপুরে কবিগুরুর কাছারিবাড়িতে বৈশাখী সাজে রবীন্দ্রভক্তদের উপচে পড়া ঢলে কাছারিবাড়িসহ আশপাশের অঞ্চল মুখরিত ও প্রাঞ্জলিত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, মণিপুরী তাঁতী শিল্প জামদানী ও বেনারশী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত মাসব্যাপী মেলা পরিচালিত হচ্ছে। এবারের শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় দেশি বিদেশি ১’শ টি স্টল নানা পসরা নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া এ মেলায় ৫টি প্যাভিলিয়ান, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য নাগর দোলা, স্লিপার ওয়াটার বল, ওয়াটার বুট, টুইষ্টার নৌকা, প্রাইভেট কার খেলা, মেরিগোসহ নানা ধরনের ব্যাতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছে বলে মণিপুরী তাঁতী শিল্প জামদানী ও বেনারশী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আমির হোসেন জানিয়েছেন। এছাড়া স্বপরিবারে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘দি লায়ন সার্কাস’ দেখারও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আয়োজকবৃন্দ। মেলার সার্বিক নিরাপত্বা ব্যবস্থা জোরদার করতে মেলার আশপাশে ৩২ টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্বার মনিটরিং করা হচ্ছে। চলমান এ শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় বিনোদন পেতে ও বৈশাখী উৎসব উদযাপন করতে পুরো শাহজাদপুরের সর্বত্রই জনমানুষের ঢল নামায় পুরো শাহজাদপুর উপজেলায় মহাউৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হয়।

About শামছুর রহমান শিশির, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ।

Check Also

ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা ডুবি, এক নারীর মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ১

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ময়না বেগম (২৩) নামে এক নারীর …

দৌলতপুরের লক্ষিকোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে গাছ বিক্রয়ের অভিযোগ

দৌলতপুরে ১৭৪ নং লক্ষিকোলা সরকারি প্রাথমিকu বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রহিতুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২ লাখ …

শাহজাদপুরে সাংবাদিক পরিবারকে নিঃশ্চিহ্নের হুমকি; থানায় ডিডি

স্বাধীন কথা ডটকম, রোববার, ১৬ জুন- ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ ঃ শাহজাদপুরে সাংবাদিক শামছুর রহমান শিশিরের পরিবারের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *