মঙ্গলবার - ডিসেম্বর ১৮ - ২০১৮ || ৭ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী || ৯ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ( বর্ষাকাল )
Home / অর্থনীতি / ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ভয়াবহ হুমকিতে

ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ভয়াবহ হুমকিতে

স্বাধীন কথা ডটকম, রোববার, ২রা ডিসেম্বর -২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ : দেশের ঐতিহ্যবাহী ও সর্ববৃহৎ কুঁটির শিল্প হলো তাঁতশিল্প। দেশের তাঁতশিল্পে কেন্দ্র শাহজাদপুর ও বিন্দু সিরাজগঞ্জসহ তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, চৌহালী, এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও পাবনা জেলার জালালপুর, আতাইকুলা, বেড়া, সাঁথিয়াসহ বৃহত্তর পাবনা জেলার তাঁতীদের মাঝে বর্তমানে চরম হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে তাঁত শিল্পের উৎপাদন কাজের প্রয়োজনীয় কাচামাল সূতা, রং এবং রাসায়নিক দ্রব্যের অস্বাভাবিক মুল্য বৃদ্ধি এবং সেই সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে ক্রয় বিক্রয়ে মন্দাভাব বিরাজ করায় এই জেলার তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে। ইতিমধ্যেই এই এলাকার প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক এবং মালিক বর্তমানে বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই চালু তাঁতগুলোও বন্ধ হয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে। পাবনা সিরাজগঞ্জের তাঁত সমৃদ্ধ অঞ্চলে ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার এবং বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। সিরাজগঞ্জ জেলায় এ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন তাঁত শুমারী না হওয়ায় নির্ভূলভাবে প্রকৃত তাঁত সংখ্যা না জানা গেলেও মিডিয়া এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সিরাজগঞ্জ জেলায় পাওয়ারলুম, চিত্তরঞ্জন (হ্যান্ডলুম) এবং পীটলুম মিলে প্রায় দেড় লক্ষ তাঁত রয়েছে। এই তাঁতের সাথে এখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন বাহারি ডিজাইনে শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতি, থ্রি-পিচ এবং গামছা অনেক উন্নত মানের এবং সারা দেশে বিপুল চাহিদা রয়েছে। এখানকার তাঁতের শাড়ী ও লুঙ্গী ভারতের বাজারে বেসরকারী উদ্যোগে রপ্তানী হয় বলে তাঁতীরা জানান। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাহিদা রয়েছে এবং সে মোতাবেক রপ্তানী হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশের তাঁতজাত সামগ্রী শুল্কমুক্ত হিসেবে বিদেশে রপ্তানী পন্যের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বলে তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকরা দাবী করেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের সাথে এই সুবিধা থাকলেও এক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা নাই। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে এই এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষভাবে তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল উত্তরবঙ্গের বৃহৎ একটি অঞ্চল। তাঁতের কাপড়ের বাজার ভাল থাকলে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভাল থাকে, আর এই বাজারে মন্দাভাব দেখা দিলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও মন্দাভাব দেখা দেয়। বর্তমানে যেমনটি হয়েছে। এই অঞ্চলের তাঁতীদের উৎপাদিত কাপড় বেচাকেনার প্রধান হাটগুলো হচ্ছে শাহজাদপুর, বেলকুচির সোহাগপুর, এনায়েতপুর, আতাইকুলা, পোড়াদহ হাট। এছাড়া টাংগাইল জেলার করটিয়া, জগারচর, বাবুর হাট ও ভূলতা গাউসিয়া হাট। এইসব হাটের মধ্যে সম্প্রতি শাহজাদপুর, সোহাগপুর, এবং এনায়েতপুর হাট ঘুরে ও অন্যান্য হাটের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাঁতীরা কাপড় বিক্রীর জন্য তাঁতবস্ত্র সাঁজিয়ে বসে আছে কিন্তু হাটে ক্রেতা বা ব্যাপারী ও পাইকারদের দেখা নেই তেমন। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশী। অথচ ২/১ বছর আগেও এসময়ে শাহজাদপুর, সোহাগপুর, এনায়েতপুর হাট, কাপড়ের ব্যাপারী এবং পাইকার ক্রেতাদের পদচারনায় থাকতো মুখরিত। এসব হাট থেকে নিয়মিত ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতের শাড়ী, লুঙ্গী, ধুতী, থ্রি-পিচ, গামছা সহ বিপুল পরিমাণ তাঁত বস্ত্র সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে আর সে অবস্থা নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটগুলোতে আগত কাপড়ের ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শুধু এই এলাকার হাটগুলোরই অবস্থা এরূপ নয়, সারাদেশে একই অবস্থা। তাঁত শিল্পের বর্তমান করুন পরিস্থিতি।
বাংলাদেশ স্পেশালাইজ টেক্সটাইল মিলস এন্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স এসোনিয়েশসের উত্তরাঞ্চলের পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দার আলী জানান, সূতা, রং, কেমিক্যালসহ তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের সকল উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে অনুপাতে উৎপাদিত কাপড়ের মুল্য বৃদ্ধি পায়নি। এক সময়ে দেশীয় তাঁতে তৈরি ঢাকাই মসলিন সারা পৃথিবীতে খ্যাতি অর্জন করেছিলো। বিশ্বখ্যাত মসলিন তৈরির পথকে চিরতরে রূদ্ধ করে দিতে বৃট্রিশ বোনিয়ারা এদেশের আত্মনিবেদিত তাঁতীদের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করে। এরপর থেকে তাঁতশিল্পের গৌরব ও ঐতিহ্য হারাতে থাকে। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আজ অবধি দেশের সর্ববৃহৎ কুঁটিরশিল্প তাঁতশিল্পের ভাগ্যোন্নয়নে কোন সরকারই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। অথচ, অপার সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি সরকারি ভাবে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে প্রতি বছর এ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব যা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প রক্ষায় ভারত থেকে সব ধরনের সূতা ও কাঁচামালের শুল্কমুক্ত প্রবেশ নিশ্চিত, তাঁত গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, তাঁতবোর্ড বিলুপ্ত করে তাঁতীদের কণ্যাণে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, বিদেশে তাঁতবস্ত্রের বাজার তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ ও প্রান্তিক তাঁতীদের ৩০ হাজার টাকা ঋণের পরিবর্তে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ ব্যবস্থা প্রচলন করা হলে তাঁতশিল্প ফিরে পাবে হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য।’ তাঁত ব্যবসায়ীরা দুঃখ করে বলেন, পূঁজি সংকটে পড়ে এলাকার ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক অসংখ্য তাঁতী ইতিমধ্যেই তাদের মূলধন হাড়িয়ে তাঁদের তাঁত বন্ধ হয়ে বেকার হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র অনেক তাঁতী জ্বালানি খড়ির দামে বিক্রি করে দিচ্ছে হস্তচালিত কাঠের তাঁত। অন্যদিকে মাঝারী এবং বড় ফ্যাক্টরী যাদের কারখানায় চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং পাওয়ারলুমে কাপড় উৎপাদিত হয়, তাদের অবস্থাও এখন ভালো নয়। নিরুপায় হয়ে গ্রাম্য সুদী ব্যবসায়ী এবং সুদী সমিতি থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র তাঁতীরা। ক্ষুদ্র তাঁতীদের মূলধনের জন্য বিভিন্ন এনজিও এবং মধ্যম ও বড় তাঁতীরা স্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করছিল। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন যাবৎ কাপড়ের বাজারে মন্দাভাব থাকায় উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে না পারায় গুদাম ভর্তি কাপড় থাকলেও তাঁত শ্রমিকদের মুজুরী ও ব্যাংক, এনজিও ও সমিতির নিয়মিত কিস্তি দিতে না পাড়ায় অনেকেই এখন হতাশ। সেই সাথে সূতা রং ক্রয় করার মত টাকা মহাজনের হাতে না থাকায় তাঁত চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে চালু তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের টাকা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। দেশের প্রাচীন শিল্প হিসেবে তাঁত শিল্প দেশের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় ভাবে মিশে আছে। বংশানুক্রমে চলে আসা তাঁত শিল্পের ধারক ও বাহক অনেক তাঁতী বর্তমান অবস্থায় এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় জড়িত হওয়ার চিন্তা ভাবনা করলেও বাস্তবতার নিরিখে তা সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ তাঁতীরা তাঁতের কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে পারদর্শী নয়। ফলে তাঁতীরা দিনে দিনে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে।

About শামছুর রহমান শিশির, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ।

Check Also

বেলকুচি প্রেসক্লাবের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা রুবেলের জন্মদিন পালিত

স্বাধীনকথা ডটকম, সোমবার ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রিঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি প্রেসক্লাবের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক ও যমুনা টেলিভিশনের …

মালয়েশিয়ায় দূতাবাসের উদ্যোগে বিজয় দিবস পালিত

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩ পৌষ ১৪২৫, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪০  মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে …

যে কারণে শেখ হাসিনাকে আরও দরকার বাংলাদেশের

বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষতায় যাওয়ার পর সরকারি ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *